গনপুর্তের প্রধান প্রকৌশলী খালেকুজ্জামান জালিয়াতিতে শাস্তি প্রাপ্ত হলেও পদায়ন ঘিরে চলছে নানান গুঞ্জন
গনপুর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী খালেকুজ্জামান চৌধুরী বিরুদ্ধে ভুয়া অফার লেটার ও শিক্ষা ছুটির ঘটনায় বিভাগীয় মামলায় পান লঘুদণ্ড সহ বিভিন্ন অভিযোগে অভিযুক্ত হলেও এখনো বহাল তরিয়াতে দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন গনপুর্ত অধিদপ্তরের। প্রধান প্রকৌশলী স্হায়ী দায়িত্ব পাওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছেন তিনি, সুত্রে আরও জানা জায়, প্রধান প্রকৌশলীর চেয়ারে বসেই বদলি ও টেন্ডার বাণিজ্যের অভিযোগ ভুয়া পিএইচডি সনদ দেখিয়ে উচ্চতর শিক্ষা ছুটিতে প্রেষণ ভোগের ঘটনায় বিভাগীয় মামলা হয় গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রকৌশলী মো. খালেকুজ্জামান চৌধুরীর বিরুদ্ধে। বিভাগীয় তদন্তে জালিয়াতি ও অসদাচরণের বিষয়টি প্রমাণিত হলে তিনি দোষ স্বীকার করেছেন। তদন্তে রিপোর্টে দোষী সাব্যস্ত হলে তাকে দেওয়া হয় লঘুদণ্ড। মাত্র এক বছরের জন্য বন্ধ রাখা হয় বেতন বৃদ্ধি। এই শাস্তির ভেতরে তিন বছরের মধ্যেই লীগের দাপটে ও প্রভাবে তিনি হন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী। মাত্র পাঁচ মাসের মধ্যে পদোন্নতি পান অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী পদে। এরপর দায়িত্ব পালন করেন গোপালগঞ্জ গণপূর্তজোনের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে।
জুলাই অভ্যুত্থানের পর তিনি খোঁজেন নতুন রাজনৈতিক পরিচয়। জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহেরের স্ত্রী ডা. হাবিবা আক্তার চৌধুরীকে (সুইটি) ‘ফুপু’ হিসেবে পরিচয় দেন গনপুর্ত অধিদপ্তরের কর্মরত সাধারণ কর্মকর্তা দের মাঝে। জামায়াতপন্থি তৎকালীন গণপূর্ত সচিব নজরুল ইসলামের তদবিরে তখন পাঁচজন জ্যেষ্ঠ প্রকৌশলীকে ডিঙিয়ে বসেন প্রধান প্রকৌশলীর (রুটিন দায়িত্ব) চেয়ারে।
দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই তার বিরুদ্ধে টেন্ডার ও বদলি বাণিজ্যের অভিযোগ ওঠে। বর্তমানে গণপূর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী (চলতি দায়িত্বে) হিসেবে আছেন তিনি । এই পদ স্থায়ী বা নিয়মিত করতে ব্যাপক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন তিনি। ইতিমধ্যেই জ্যেষ্ঠ প্রকৌশলীদের ডিঙিয়ে পদোন্নতির সংক্ষিপ্ত তালিকার শীর্ষেনিজের নাম বসাতে সমর্থ হয়েছেন। বাকি জ্যেষ্ঠ প্রকৌশলীদের বাদ দিতে তাদের বিরুদ্ধে জুলাই গণহত্যার সাজানো মামলার তথ্য জমা দেওয়া হয়েছে সুপিরিয়র সিলেকশন বোর্ডে (এসএসবি)। গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় এবং অধিদপ্তরের দালিলিক নথিপত্র পর্যালোচনায় এসব তথ্য উঠে এসেছে।
রাজনৈতিক আত্মীয়তায় জ্যেষ্ঠতা ডিঙিয়ে পদোন্নতি গণপূর্ত অধিদপ্তরের কর্মকর্তা তালিকা ও পার্সোনাল ডাটা শিট (পিডিএস) পর্যালোচনায় দেখা যায়, খালেকুজ্জামান চৌধুরী ক্ষমতার পালাবদলের সুযোগ বারবার কাজে লাগিয়েছেন। ১৯৮৯ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত চাকরিজীবনে সরকারি প্রেষণ ও ছুটির সুযোগে তিনি প্রায় ১১ বছর অস্ট্রেলিয়ায় ছিলেন। পদোন্নতির সুযোগ তৈরি হলেই দেশে ফিরে এসেছেন। প্রেষণে যেতে তিনি ভুয়া অফার লেটার ও জাল কাগজপত্র তৈরি করেছিলেন। এতে বিদেশে দেশের ভাবমূর্তিক্ষুণ্ন হয়। এ ঘটনায় ২০১৬ সালের ২৩ আগস্ট তৎকালীন গণপূর্ত সচিব মো. শহীদ উল্লা খন্দকার তার এক বছরের বেতন বৃদ্ধি স্থগিত করেন।পতিত আওয়ামী লীগ নেত্রী সৈয়দা সাজেদা চৌধুরীর সুপারিশে গুরুদণ্ড এড়িয়ে সে যাত্রায় এই লঘুদণ্ড পান তিনি। বিভাগীয় মামলার তিন বছরের মধ্যেই এই আওয়ামী লীগ নেত্রীর লিখিত সুপারিশে খালেকুজ্জামান একই বছরে দুই দফা পদোন্নতি পান। তখন সাজেদা চৌধুরীকে ‘ফুপু’ ডাকতেন খালেকুজ্জামান চৌধুরী বলে একাধিক সুত্রে আরও জানা গেছ। সরকারি চাকরির সার্ভিস রেকর্ড বলছে, ২০১৯ সালের ২২ জুলাই খালেকুজ্জামান চৌধুরী নিয়মিত পদোন্নতি পান তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী পদে। এর কয়েক মাসের মাথায় ১৫ ডিসেম্বর পদোন্নতি পান অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে। রীতি ভেঙে তখন এই পদোন্নতি দেওয়া হয় তাকে। জুলাই অভ্যুত্থানের পর বদলে যায় খালেকুজ্জামান চৌধুরীর দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অবস্থান। আওয়ামী লীগের বদলে এবার জামায়াত ঘনিষ্ঠ বনে যান তিনি।
জামায়াতপন্থি সাবেক সচিব নজরুল ইসলাম এবং জামায়াত নেতা ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহেরের তদবিরে ২০২৫ সালের ২৭ অক্টোবর পাঁচজন জ্যেষ্ঠ প্রকৌশলীকে ডিঙিয়ে বসেন প্রধান প্রকৌশলীর (চলতি) চেয়ারে। এর আগে তাকে গোপালগঞ্জ থেকে দেওয়া হয়েছিল ঢাকা মেট্রো জোনের দায়িত্ব। খালেকুজ্জামানের বাড়ি ফরিদপুর জেলার নগরকান্দা উপজেলার তালমা গ্রামে। একই উপজেলার ফুলসুতি গ্রামে জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহেরের শ্বশুরবাড়ি।
ডা. তাহেরের শ্বশুর আহম্মদ উল্লাহ চৌধুরী এবং খালেকুজ্জামানের বাবা বদিউজ্জামান চৌধুরী সম্পর্কেচাচা-ভাতিজা। এই সূত্রে জামায়াত নেতার স্ত্রী ডা. হাবিবা আক্তার চৌধুরীকে (সুইটি) তিনি ডাকেন ‘ফুপু’। এই আত্মীয়তার সুবাদে গত অন্তর্বর্তী সরকারের সময় ডা. তাহেরের প্রভাবে জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন করে পদোন্নতি পান। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি ক্ষমতায় এলে আবারও নিজের রাজনৈতিক রূপ বদলে ফেলেন এই কর্মকর্তা। বর্তমানে নিজেকে পরিচয় দেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলামের ঘনিষ্ঠ ও আত্মীয় হিসেবে গনপুর্ত অধিদপ্তরে।
জ্যেষ্ঠদের বাদ দিতে সাজানো মামলার তালিকা প্রধান প্রকৌশলী পদ স্থায়ী করতে সুপিরিয়র সিলেকশন বোর্ডের (এসএসবি) বৈঠকের জন্য গত ৬ জুলাই গণপূর্ত মন্ত্রণালয় থেকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয় পাঁচজন অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলীর তালিকা। এই তালিকায় প্রশাসনিক জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে। বর্তমানে অধিদপ্তরের দাপ্তরিক জ্যেষ্ঠতার তালিকায় শীর্ষে আছেন অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. আবুল খায়ের (ঢাকা জোন) ও উৎফল কুমার দে (রিজার্ভ)। জ্যেষ্ঠতার হিসেবে তিন নম্বরে থাকা খালেকুজ্জামান চৌধুরী নিজেকে তালিকার এক নম্বরে বসাতে সমর্থ হয়েছেন কারসাজির মাধ্যমে। তালিকায় আরও আছেন মো. শহিদুল আলম (স্বাস্থ্য উইং) এবং ড. মোহাম্মদ গিয়াসউদ্দিন হায়দার (প্রেষণে মহাপরিচালক, এইচআরআই)।
নথিপত্র বলছে, তালিকা থেকে সিনিয়রদের স্থায়ীভাবে বাদ দিতে জুলাই অভ্যুত্থানের পর রামপুরা থানার একটি মামলার আসামির তালিকায় কৌশলে এসব জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাসহ মোট ৪৭ জন প্রকৌশলীর নাম ঢোকানো হয়েছে বলে একাধিক কর্মকর্তারা আজকের সংবাদ কে জানান। এই মামলার নথি এসএসবি কমিটিতে জমা দিয়ে তাদের অবস্থান দুর্বল করার চেষ্টা করা হয়, যাতে জ্যেষ্ঠতার তালিকায় তিন নম্বরে থাকা খালেকুজ্জামান চৌধুরীর শীর্ষ পদ পাওয়ার পথে কোনো বাধা না থাকে।
বদলি বাণিজ্য ২০২৫ সালের ২৭ অক্টোবর গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনে খালেকুজ্জামান চৌধুরীকে দেওয়া হয় প্রধান প্রকৌশলীর রুটিন দায়িত্ব। পরে দেওয়া হয় চলতি দায়িত্ব। দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই অধিদপ্তরে বদলি বাণিজ্যের অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আওয়ামী লীগপন্থি হিসেবে পরিচিত কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ পদে পুনর্বাসনে করতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন তিনি। দুর্নীতির দায়ে বরখাস্ত হওয়া প্রকৌশলী মো. সাইফুজ্জামানকে পুনর্বাসনের সুযোগ দিতে পুরোনো তারিখে জারি করা হয় বদলির আদেশ। সাইফুজ্জামান ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের গণপূর্তমন্ত্রী শরিফ আহমেদের ঘনিষ্ঠ ছিলেন।
গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় গত ৩ ফেব্রুয়ারি এক আদেশে দুর্নীতির দায়ে সাইফুজ্জামানকে বরখাস্ত করে। ওই আদেশে তাকে উল্লেখ করা হয় লালমনিরহাটের নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে। কিন্তু গণপূর্ত অধিদপ্তরের ওয়েবসাইটে ১৫ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত আরেক আদেশে দেখা যায়, বরখাস্তের এক দিন আগে অর্থাৎ ২ ফেব্রুয়ারি তাকে ঢাকায় রিজার্ভে বদলি করা হয়েছে। ৩ তারিখে বরখাস্ত হওয়া একজন কর্মকর্তা কীভাবে ২ তারিখে ঢাকায বদলি হন, আর তা প্রকাশিত হয় ১৫ তারিখে। এমন অসামঞ্জস্যপূর্ণ নথিকে জালিয়াতির ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন দপ্তর সংশ্লিষ্টরা।
কমিশন না পাওয়ায় টেন্ডার বাতিল বদলি বাণিজ্যের পাশাপাশি বড় প্রকল্পের টেন্ডার পুনর্মূল্যায়নের নামে কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগ রয়েছে প্রধান প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে। ঢাকা গণপূর্তবিভাগ-১, বিভাগ-৩ এবং শেরেবাংলা নগর গণপূর্তবিভাগ-২-এর অধীনে বড় অঙ্কের পাঁচটি দরপত্র কমিশন সংক্রান্ত অসন্তোষের কারণে পুনর্মূল্যায়নের জন্য ফেরত পাঠানো হয়,শুধু মাত্র তার আর্থিক দুনীতির কারণে। পিপিআর ২০২৫ (পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস)-এর ত্রুটির অজুহাত দেখানো হলেও সূত্র বলছে, নতুন পিপিআর চালুর পর সব প্রকৌশলীকে যথেষ্ট প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। প্রকৃতপক্ষে নির্ধারিত কমিশন না পাওয়ায় পুনর্মূল্যায়নের অজুহাতে এসব টেন্ডার আটকে রাখা হয়েছিল।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অধিদপ্তরের একাধিক প্রকৌশলী ও ঠিকাদার আজকের সংবাদ কে জানান, সাবেক প্রধান প্রকৌশলী শামীম আখতারকে সরানোর পরও দুর্নীতি থামেনি। বরং খালেকুজ্জামান চৌধুরীর নেতৃত্বে গড়ে উঠেছে নতুন একটি শক্তি শালী সিন্ডিকেট। এই সিন্ডিকেটকে আর্থিক সুবিধা দিতে পারা কর্মকর্তারাই সুবিধাজনক পদে বহাল রয়েছেন।
খালেকুজ্জামান চৌধুরীর দুর্নীতি, নথি জালিয়াতি, জ্যেষ্ঠতা লঙ্ঘন এবং দেশে-বিদেশে অবৈধ সম্পদ অর্জনসংক্রান্ত তথ্য প্রমাণসহ দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) জমা পড়েছে লিখিত অভিযোগ বলে আজকের সংবাদ কে জানান একাধিক কর্মকর্তার সহ ভুক্তভোগীরা। কর্মকর্তা ও ঠিকাদার দুদকে সরাসরি হাজির হয়ে জমা দিয়েছেন দালিলিক প্রমাণ। ‘ক্ষমতা বদলালেই তৈরি হয় নতুন আত্মীয়তা’ তারা নিজেকে ক্ষমতার কাছাকাছি রাখতে কোনো না কোনো আত্মীয়তার সম্পর্কতৈরি করে নিজের আখের গুছিয়ে লাগামহীন দুনীতি করে হাতিয়ে নিয়েছেন বিপুল পরিমাণ অর্থ। লীগের ক্ষমতা চলে যাওয়ার পরে তাদের ফের নতুন ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে আত্মীয়তার সম্পর্কতৈরি করে (খালেকুজ্জামান চৌধুরী) দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন গনপুর্ত অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী পদে। প্রধান প্রকৌশলী খালেকুজ্জামান চৌধুরী কারসাজির কারণে অতিষ্ঠ সাধারণ কর্মকর্তারা। উল্লেখীত অভিযোগের ব্যাপারে তাঁর মোবাইলে ফোন দিলে ফোন রিসিভ না করার কারণে তাঁর কোন মতামত পাওয়া যায়নী।খুদে বার্তা পাঠালে তার কোন উত্তর দেয়নী।




















